মার্কিন শুল্কনীতি

বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কায় শিপিং শিল্পজুড়ে উদ্বেগ

কভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে বৈশ্বিক শিপিং শিল্পের সামনে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দেশে দেশে নিম্ন প্রবৃদ্ধি।

কভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে বৈশ্বিক শিপিং শিল্পের সামনে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দেশে দেশে নিম্ন প্রবৃদ্ধি। এ সংকট কাটিয়ে ওঠার আগেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও গাজায় ইসরায়েলি হামলার কারণে ব্যাহত হয় সরবরাহ চেইন। এখন নতুন করে শিপিং শিল্পে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের সৃষ্ট বাণিজ্যযুদ্ধে বদলে যেতে পারে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি, যা সমুদ্র পরিবহনের চাহিদাকে আরো চাপে ফেলার পাশাপাশি খাতটির অস্থিতিশীলতাকে বাড়িয়ে তুলবে। খবর দ্য ন্যাশনাল।

নতুন নীতি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে রফতানীকৃত সব পণ্যের ওপর কমপক্ষে ১০ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক প্রযোজ্য হবে। চীনের জন্য যা বেড়ে ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছবে। এটি চীনের পাশাপাশি ভিয়েতনাম, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো প্রধান মার্কিন বাণিজ্য অংশীদারদের রফতানি চাহিদা ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এর প্রভাবে আগামী কয়েক প্রান্তিকে এনওয়াইকে, কসকো, মায়ের্স্কের মতো শিপিং কোম্পানিগুলোর আয় কমে যেতে পারে।

ব্লুমবার্গ ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষকরা বলছেন, বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর শুল্ক আরোপ বিশ্ব বাণিজ্যে রুট বদলে দেবে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিপিং চাহিদায় দ্রুত মৌলিক পরিবর্তন আনবে।

এরই মধ্যে মার্কিন বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও কাস্টমস গুদামে ১০ শতাংশ ভিত্তি শুল্ক আদায় শুরু হয়েছে। আর বড় বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর চাপানো বাড়তি শুল্ক কার্যকর হবে ৯ এপ্রিল। এ পদক্ষেপ পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধে রূপ নেয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা। ফলে বৈশ্বিক মন্দা ও প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপের ঝুঁকি বাড়ছে। চীন এরই মধ্যে ১০ এপ্রিল থেকে মার্কিন আমদানি পণ্যের ওপর ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।

ফ্রেইটোস গ্রুপের গবেষণা প্রধান জুদাহ লেভিন বলেন, ‘এবারের শুল্ক এতটাই বিস্তৃত ও বেশি যে শুল্কমুক্ত বিকল্পের প্রায় কোনো উপায় নেই। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি খরচ বাড়বেই। প্রতিশোধমূলক শুল্কের কারণে মার্কিন রফতানির চাহিদা কমবে, যা কৃষি ও উৎপাদন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছিলেন, অভিধানের তার প্রিয় শব্দ ‘শুল্ক’। এ কারণে নভেম্বর থেকে অনেক আমদানিকারক দীর্ঘদিন টিকে থাকে এমন পণ্য কিনতে শুরু করেন। ফলে গত বছরের শেষ দিকে মার্কিন আমদানি তুলনামূলক বেশি ছিল।

জুদাহ লেভিন বলেন, ‘৯ এপ্রিলের আগে লোড হওয়া পণ্য শুল্কের আওতায় না পড়ায় কয়েকদিনের জন্য আমদানির হার এবং খরচ সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। যেহেতু অনেক আমদানিকারক আগেভাগে পণ্য মজুদ করে ফেলেছেন, এরপর তারা নতুন ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিতে বা সাময়িক বিরতি নিতে পারেন।’

লেভিনের আশঙ্কা, এতে কনটেইনার পরিবহন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমবে। এমনকি ব্যবসার ভরা মৌসুমেও এর মাত্রা অত্যন্ত কম হতে পারে। এর আগে ২০১৮ সালে শুল্কের কারণে আগাম আমদানি বাড়ায় ২০১৯ সালে সরবরাহের চাহিদা কমে গিয়েছিল।

মার্কিন শুল্ক পদক্ষেপ কনটেইনার শিপিংকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে শিপিং কোম্পানিগুলোর সংগঠন বিআইএমসিও। এর প্রধান বিশ্লেষক নিয়েলস রাসমুসেন বলেন, ‘শিপিং শিল্পের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে কনটেইনার খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ট্যাংকার ও বাল্ক পণ্যের অনেকটাই এখন পর্যন্ত শুল্কের বাইরে রয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ কনটেইনার পণ্যই শুল্কের আওতায় পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘যদি শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কনটেইনারে আমদানির প্রবৃদ্ধি শূন্যে নেমে আসে, তবে বৈশ্বিক কনটেইনার প্রবৃদ্ধি দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে যাবে।’

মেরিটাইম ডাটা গ্রুপ ভেসন নটিক্যালের বিবৃতি অনুসারে, শুল্ক নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কারণ যেকোনো পাল্টা পদক্ষেপ বৈশ্বিক শিপিং খাতকে প্রভাবিত করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমে যেতে পারে, পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতিও হতে পারে।

এদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন এখনো মন্থর প্রবৃদ্ধি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে বৈশ্বিক চাহিদার অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে দেশটি। ভেসন নটিক্যাল বলছে, চীনের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে রফতানির ওপর নির্ভরশীল। বাণিজ্যযুদ্ধ এ নাজুক অবস্থাকে আরো খারাপ করতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ২ এপ্রিল পারস্পরিক শুল্কের ঘোষণা দেন। এদিনকে ‘লিবারেশন ডে’ হিসেবেও অভিহিত করেন। কিন্তু নীতিগত অনিশ্চয়তা সরবরাহ চেইনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফ্রেইট প্রাইসিং প্লাটফর্ম জেনেটার প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ড বলেন, ‘লিবারেশন ডে জাহাজে পণ্য পরিবহনকারীদের জন্য মোটেই মুক্তির দিন নয়। যখন নিয়মগুলো বারবার পরিবর্তন হয়, তখন সাপ্লাই চেইন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক মার্কিন শিপার এখন ১ মে থেকে কার্যকর হওয়া নতুন দীর্ঘমেয়াদি কনটেইনার ফ্রেইট চুক্তির বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।’

এক সংশোধিত পূর্বাভাসে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) বলেছে, জানুয়ারি থেকে আরোপিত শুল্কসহ নতুন মার্কিন শুল্কের ফলে ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য প্রায় ১ শতাংশ কমতে পারে।

ডব্লিউটিও মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়ালা বলেন, ‘বাণিজ্যে পতন ও সম্ভাব্য শুল্কযুদ্ধের বিষয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা বৈশ্বিক বাণিজ্যে আরো পতন ঘটাতে পারে।’

আরও